দেশী পণ্য এবং আড়ং এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র
দাম বেশি রাখার কারনে আড়ং কে বার
বার জরিমানা করা হচ্ছে। আমি জানি না ভোক্তা অধিকারের কোন ধারা লঙ্ঘনের কারনে এমনটা
করা হচ্ছে। অন্যদিকে আড়ং এর বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তারা তাদের প্রভাব খাটিয়ে
ম্যাজিস্ট্রেটকে ঢাকা থেকে খুলনায় বদলি
করেছে। আমার দৃষ্টিতে দুটোই অপরাধ, কিন্তু দুটো ভিন্ন অপরাধ । একটা অপরাধের
ওজুহাতে অন্য অপরাধ করা এবং ২০ বছরের টেকসই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করা কোন ভাবেই উচিৎ
না।
ইংল্যান্ডে যখন ছিলাম তখন একদিন
ভুল করে Harrods-এ ঢুকে পড়েছিলাম সেখানে দেখেছিলাম একটি সার্টের দাম ছিল ১৭০০ পাউণ্ড মানে বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ২ লক্ষ টাকা।আমার তখন মনে হয়েছিল যে
সুতো দিয়েই বানানো হোক না কেন , একটি
সার্টের দাম কি কখনও ২ লক্ষ টাকা হতে পারে? সাধারন ভাবে চিন্তা করলে কক্ষনই এইটা
হতে পারে না , এই দাম একেবারে অসম্ভব বলে মনে হতে পারে। তাহলে এতো বেশি দাম তারা
লিখল কেন , আর তাদের দেশের আইন কানুন এইটা হতে দিল কেন? Communication and Branding এর ছাত্র হওয়ার সুবাদে জানি, কেন একটি উন্নত দেশের আইন ১ হাজার টাকার সার্টকে
২ লক্ষ টাকায় বিক্রি করতে উৎসাহ দেয়। ১ হাজার টাকার সার্টে কি কি যুক্তি এবং সেবা
যুক্ত হয়ে সেটা ২ লক্ষ টাকার সার্ট হয়ে যায়।
Band Image, Quality, Customer Service, After Sales Service, Customer comfort, Luxury, Security, Business Position, Business Profit ইত্যাদি বিষয়গুলো ব্যবসায়িক পরিকল্পনার ভেতর নিয়ে আসলে একটি সার্টের দাম ২ লক্ষ টাকা হওয়া স্বাভাবিক বলে মনে হবে। আরও বেশি কর্ম সংস্থান সৃষ্টি করতে হলে, পণ্যের গুনগত মান বৃদ্ধি করতে হলে, দেশের মানুষকে বিদেশে বাজার করতে নিরুৎসাহিত করতে হলে, দেশের টাকা দেশে রাখতে হলে ব্যান্ড ইমেজ প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নাই। আড়ং ব্যবসার শুরু থেকেই ব্যান্ড ইমেজ প্রতিষ্ঠা করার জন্য কাজ করেছে।
আমাদের দেশে আড়ং একমাত্র দেশি
ব্যান্ড যারা কিনা দেশের ঐতিহ্য, আবহ, কুটির শিল্প, পোশাক, শিল্পকলাকে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার
জন্য কাজ করছে। আগে মানুষ গ্রামীণ চেক , ডিজাইন দেখে নাকসিটকাতো কিংবা অবজ্ঞার
দৃষ্টিতে দেখতো! কিন্তু এখন গ্রামীণ ডিজাইনের পোশাক পরে গর্ব বোধ করে!
সাধারন মানুষ দেশের পণ্য কিনে গর্ব
বোধ করে, এই রকম পণ্য আর কোন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করতে পারে নি! পেরেছে কি?
এতো বৃহত্তর পরিসরে দেশি পণ্যের
সমাহার অন্য কোন প্রতিষ্ঠান করতে পেরেছে
কি?
দেশি পণ্য বিক্রি করে এতো বেশি
কর্মসংস্থান কেউ সৃষ্টি করতে পেরেছে কি?
সাধারন মানুষ দেশি পণ্য কেনার
জন্য উৎসাহ বোধ করে এবং অন্যকে কিনতে উৎসাহিত করে এই রকম প্রতিষ্ঠান / সিস্টেম আর
কেউ দাড় করাতে পেরেছে কি?
যেখানে সব নকলের ছড়াছড়ি শেখানে
অনেক উচ্চ মূল্যের বেতন দিয়ে মেধাবী ডিজাইনার দিয়ে নিজস্ব ব্যান্ডের পণ্য সৃষ্টি
করেছে কি?
সম্পূর্ণ দেশীয় পণ্য বিক্রি করে
এক নামে আড়ং এর মত কেউ পরিচিতি লাভ করতে পেরেছে কি?
এই সবগুলো প্রশ্নের উত্তর হবে না!
কিন্তু কেন?
অন্য কোন প্রতিষ্ঠান গর্ব
করার মত ব্যান্ড প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি স্বাধীনতার এতো বছর পরও? অথচ পোশাক
রফতানিতে আমরা পৃথিবীর ২য় অবস্থানে চলে
গেছি কিন্তু ব্যান্ড প্রতিষ্ঠায় আছি তলানির দিকে!
একটি ব্যান্ড প্রতিষ্ঠা করতে কোয়ালিটি মেইনটেন করতে হয়, উচ্চবেতন দিয়ে ডিজাইনার নিয়োগ দিতে হয়, কাস্টমার কে ভালমানের সেবা দিতে হয়, কর্মকর্তা কর্মচারীদের হাঁসিমুখে কাস্টমার সার্ভিস দেয়ার জন্য তাদের মোটা অংকের বেতন দিতে হয়, সরকারকে ভ্যাট- ট্যাক্স দিতে হয়, ইনটোরিওর ডেকোরেশন, এসির বিলের খরচের কথাও ব্যবসায়িক পরিকল্পনার মধ্যে রাখতে হয়। এতো সব সত্য এবং স্বচ্ছ সেবা দেয়ার পর ৮৩৬ টাকার পাঞ্জাবী ১২১১ টাকায় বিক্রি করলে, কিভাবে সেটা অপরাধ বলে গণ্য হয়?
ইসলামের বাণিজ্য আকিদায় আছে বিক্রেতা
এবং ক্রেতা কোন দ্রব্য বিনিময়ের সময় সন্তুষ্টচিত্তে একটা দাম নির্ধারণ করলে সেটাই
ঐ পণ্যের দাম হবে। অর্থাৎ ক্রেতা এবং বিক্রেতার সন্তুষ্টিই আসল। এখানে তৃতীয় কোন
পক্ষের বলার খুব বেশি কিছু থাকে না।
আমার জানামতে আড়ং – একোন ক্রেতাকে কোন পণ্য কিনতে বাধ্য করা হয়
না। বেশি টাকা দিয়ে কোন ক্রেতা পণ্য
কিনলেও ঠকে গেছে বলে মনে করে না! এইটার একমাত্র কারন আড়ং কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ
করে তারা একটি ব্যান্ড ইমেজ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে , মানুষকে দেশি লাক্সারি ফিলিংস
দিতে পেরেছে, দেশী পণ্য কিনে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছে , বিদেশী পণ্য না
কিনে দেশী পণ্য কিনে মানুষকে দেশেই বিনিয়োগের অনুভূতি দিতে পেরেছে , দেশের টাকা
দেশেই রাখতে পেরেছে।
পণ্য এবং সেবার মানের জন্য যদি
কাজ করতেই হয় তবে খাবারের মান উন্নয়নের জন্য কাজ করুন। খাবারে ভ্যাজাল বিরোধী
অভিজান বেশি বেশি পরিচালিত করুন। স্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে দেশের মানুষের সুস্বাস্থ্য বাড়লে , তাদের টাকা
আয়ের সম্ভাবনা এবং সুযোগ বাড়বে। বেশি টাকা দিয়ে তারা তখন উন্নত মানের পণ্য কিনতে
পারবে। জনগনের টাকা দিয়ে তখন আপনারও বেতন বাড়ানো যাবে। মনে রাখবেন বিবেচনা ছাড়া
সততা; নিষ্ঠুরতায় রুপ লাভ করতে পারে ।
জেনে
কিংবা না জেনে ব্যান্ড ইমেজ প্রতিষ্ঠায়
বাঁধা প্রদান করলে দেশে কোন ভাল মানের টেকসই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান দাঁড়াবে না। নতুন করে
কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। দেশী পণ্যের নতুন কারিগর তৈরি হবে না। দেশী পণ্য কিনতে কেউ উৎসাহিত হবে না। ব্যাংকে
অলস টাকা পড়ে থাকবে, লোকসানের ভয়ে মানুষ বিনিয়োগ করতে ভয় পাবে। বিদেশী পন্যে দেশের
বাজার সয়লাব হয়ে যাবে। দেশে যারা ধনী অথবা
উঠতি ধনী তাদের নিম্ন মানের পণ্য বিক্রি করে দেশের বাজারে ধরে রাখা যাবে না।
বিদেশে বেশি টাকা দিয়ে পণ্য কিনে নিয়ে আসবে। ফলে দেশের টাকা বাইরে চলে যাবে।
দুধ, ঘোল আর ঘি যে কারনে একই দামে বিক্রি করা যায় না ঠিক একই কারনে পণ্য এবং ব্যান্ডের পণ্য একই দামে বিক্রি করা যায় না। আসুন পণ্য, ভাল মানের পণ্য, ব্যান্ডের পণ্যের মধ্যে পার্থক্যগুলো বোঝার চেষ্টা করি। দেশী পণ্য কিনে ধন্য হওয়ার জন্য দেশী পণ্যের মান বাড়ানো যেমন জরুরী তেমনি পণ্য গুলোকে সম্মান এবং সৌন্দর্যের সাথে সেগুলো ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেয়াও জরুরী। আড়ং ঠিক এই কাজটিই করছে, উচ্চ মানের দেশী পণ্য, সম্মানের সাথে ক্রেতার কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। আসুন তাদের উৎসাহ দেই, সাধ্যানুযায়ী তাদের পণ্য কিনি । দেশের পণ্য কিনে দেশের সেবা করি।


Comments
Post a Comment