টার্কির প্রতিদ্বন্দ্বী
বহির্বিশ্বে টার্কির আগমন অনেক আগে হলেও , আমাদের দেশে এই
পাখির আগমন অতি সাম্প্রতিক।তাই ভোক্তা পর্যায়ে এ পাখির খবর তেমন একটা পৌঁছায়নি। বড়
বড় কোম্পানির মাধ্যমে এই পাখির প্রসার ঘটেনি।
মিডিয়াতে টার্কির বিজ্ঞাপনও চোখে
পড়ে না। আবার ছোট খামারিদের বিজ্ঞাপন প্রচার
করার মত অর্থ থাকে না। তাই
টার্কির খবর বেশিরভাগ সাধারন মানুষ জানে না। যারা একটু সচেতন তারাও ইন্টারনেটে
থেকে বাংলা ভাষায় টার্কি সম্পর্কিত তেমন তথ্য খুঁজে পায় না - তাই ইংরেজিতে
প্রকাশিত গবেষণা পত্র গুলো থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সবাই ব্যবহার করতে পারে না।
টার্কির যতটুকু
প্রসার ঘটেছে তার সবটুকুই হয়েছে মুখে মুখে। অথচ প্রথম থেকেই নতুন একটি পণ্যের প্রসারের জন্য বিপনন , বিজ্ঞাপন ,
মিডিয়াই প্রচার , ইন্টারনেটে বাংলা ভাষায় পর্যাপ্ত তথ্য থাকা অতি জরুরী ছিল। আর এর অভাবে সুশৃঙ্খল প্রচার প্রচারনা না থাকায়; ইতিমধ্যে টার্কি সম্পর্কিত নানারকম গুজব বাজারে
ছড়িয়ে পড়েছে। বাজার হয়ে উঠেছে অস্থিতিশীল,
যে যেভাবে পারছে দাম নির্ধারণ করে বেচা বিক্রি করেছে। ফলে ভোক্তা পর্যায়ে অবিশ্বাসের আবহাওয়া সৃষ্টি হয়েছে। এসব সমস্যাকে
সামনে রেখে নতুন সম্ভাবনার খুঁজতে আমরা আলোচনা করবো সিরিজ আকারে প্রকাশিত টার্কি
সম্পর্কিত সব প্রবন্ধে।
টার্কি সম্পর্কিত ধারাবাহিক প্রবন্ধে সম্ভাবনামূলক এই শিল্পের উজ্জল দিক এবং এর সাথে জড়িত জটিলতার
কারন এবং প্রতিকার খুঁজবো। আমাদের মনে
রাখতে হবে টার্কি অপেক্ষাকৃত নতুন এক শিল্প । এই শিল্পকে টেকসই বা শুধু টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের
তথ্য এবং বাস্তব অভিজ্ঞতায় দিক থেকে
সমৃদ্ধ হতে হবে।
প্রতিযোগিতামূলক ভোক্তার বাজারে টিকে থাকতে হলে টার্কিকে কিসের
সাথে এবং কার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে
তা নিয়েই আজ আমরা আলোচনা করবো।
আমাদের প্রথম ও প্রধান কাজ টার্কির
প্রতিদ্বন্দ্বীকে খুঁজে বের করা!
একবার কোকাকোলার প্রচার এবং প্রসার সম্পর্কিত এক সেমিনারে
সঞ্চালক সবাইকে প্রশ্ন করেছিল, কোকাকোলাকে মার্কেটে জনপ্রিয় করতে আপনারা কে কি করতে পারেন? নানান জন তাদের নানান
রকম আইডিয়া দিল। সবার আইডিয়াগুলোকে
গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হল।
সঞ্চালকের ২য় প্রশ্ন ছিল, কোকাকোলার প্রতিদ্বন্দ্বী কে?
কেউ উত্তর দিল- পেপসি , সেভেনআপ ,
কেউ উত্তর দিল- এনার্জি ড্রিংক
কেউ বলল - স্থানীয় ভাবে প্রস্তুতকৃত কোন জুসের নাম।
কিন্তু অংশগ্রহণকারিদের
একজনও কল্পনাকরেনি সঞ্চালক কোকাকোলার
প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম বলবে “পানি”,
দয়াকরে একটু থামুন , একটু চিন্তাকরুন “কোকাকোলার প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে পানি”।
ব্যবসায়ীক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, প্রেরণা এবং দূরদর্শিতা কোন
পর্যায়ে পৌছলে এই রকম প্রতিদ্বন্দ্বীর কথা কল্পনা করা যায়।
তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা - পানির অপর নাম যেমন জীবন , পার্টির
অপর নাম হবে কোকাকোলা। পানি ছাড়া যেমন মানুষ বাচতে পারে না, কোকাকোলা পান করা ছাড়া
মানুষ বাচতে পারবে না।
এই সব লক্ষ্য
কোকাকোলা অনেক আগেই অর্জন করে ফেলেছে , এখন তারা পানিকে মরন কামড় দেয়ার খুব
কাছাকাছি পৌঁছে গেছে অনেক দেশে। আমাদের
দেশেও অনেকেই পানির বদলে এখন কোক বেশি পছন্দ করে।
এখন টার্কির প্রসঙ্গে ফিরে আসি, টার্কিকে জনপ্রিয় করতে হলে এবং এই ব্যবসাকে টেকসই করতে হলে আগে টার্কির প্রতিদ্বন্দ্বী খুঁজে বের করতে হবে।
আমার অভিজ্ঞতায় টার্কির নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পোলট্রির
ব্রয়লার মুরগি। টার্কির দাম, সহজলভ্যতা, পালন খরচা, ঔষধিগুন, পুষ্টিগুন ইত্যাদি সূচকে ব্রয়লার
মুরগিকে অতিক্রম করতে না পারলে টার্কি জনপ্রিয়তা পাবে না।
তবে কাজটা যে খুব একটা সহজ হবে না, সেটা মনে রাখতে হবে। ইতিমধ্যে ব্রয়লার , লেয়ার
মুরগির মার্কেট ফুলে ফেঁপে অনেক বড় হয়েছে। দেশি-বিদেশী নানান কোম্পানি শত শত কোটি
টাকা বিনিয়োগ করে রেখেছে। তারা খুব সহজে
টার্কির প্রসার হতে দেবে না। ব্রয়লার লেয়ারের বাচ্চা উৎপাদন তারা যেভাবে নিয়ন্ত্রণ
করে টার্কির ক্ষেত্রে সেইরকমটা পারবে না, তাই টার্কির বিরুদ্ধে প্রচার প্রচারণাতে
তারা সব শক্তি দিয়ে মাঠে নামবে। টার্কিকে শকুনের সাথে তুলনা করে মানুষের মনে ঘৃণা
ছড়িয়ে দেবে । গবেষণাগারে টার্কির জন্য তৈরিকৃত রোগ জীবাণু খাবার বা ওষুধের মাধ্যমে
ছড়িয়ে দিলেও খুব বেশি আশ্চর্য হব না। মধ্য কথা বড় বড় কোম্পানিগুলো কোনভাবেই
টার্কিকে ব্রয়লার লেয়ার মুরগির উপরে উঠতে দেবে না।
তবে আশার কথা হচ্ছে টার্কির পুষ্টি এবং ঔষধি গুন আছে সেগুলোর প্রচার
এবং প্রসার করতে পারলে , টার্কির জনপ্রিয়তাকে কেউ ঠেকিয়েও রাখতে পারবে না। টার্কির
গোস্তের গুনাগুনের কারনে অদূর ভবিষ্যতে টার্কি হয়ে উঠবে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের প্রথম
পছন্দ । আর সচেতন মানুষের সংখ্যা ২০% হলেও এদের হাতেই ৮০% টাকা গচ্ছিত থাকে। এরাই বাজারের মূল ভোক্তা হয়ে থাকে। এইসব ধনিক শ্রেণী এবং স্বাস্থ্য সচেতন
মানুষের কথা মাথায় রেখেই টার্কিকে উপযোগী
করে লালন-পালন করতে হবে।
তবে বড় লক্ষ্য থাকবে সাধারন মানুষের কাছে সহজলভ্য করা। টার্কিকে গরুর গোস্তের সাথে কসায়খানার বিক্রি করতে হবে। উৎপাদন
খরচ কমাতে হবে। মাঠে ঘাটে গরু, ছাগল ,
ভেড়ার মত চারন ভূমিতে টার্কি চরাতে হবে। মোট কথা টার্কিকে আর বিদেশি পাখি হিসেবে
নয় , এটাকে দেশি পাখি বানিয়ে ফেলতে হবে। একবার এই পাখিকে আমাদের সংস্কৃতির অংশ
বানাতে পারলে এই সেক্টর নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না। টার্কি পাখির ব্যবসা একটি টেকসই ব্যবসায় রুপান্তরিত হবে।
গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়ে সব টার্কি খামারিদের সমৃদ্ধ
করুন।আপনার দৃষ্টিতে টার্কির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী কে? আর সেই প্রতিদ্বন্দ্বীর
মোকাবেলা কিভাবে করা যায় বলে আপনি মনে করেন? আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত আমাদের সাথে
শেয়ার করবেন । দেশ ও দশের কল্যাণে টার্কি শিল্পকে এগিয়ে নিতে অবদান রাখবেন।

Comments
Post a Comment